খুনির ভাইকে প্রার্থী মানতে নারাজ বিজেপি কর্মী, বিক্ষুব্ধরা দাঁড় করালেন নির্দল প্রার্থী

তনুজ জৈন (মালদা): বিজেপির প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পরেই শহর কলকাতা ও বিভিন্ন জেলার প্রকাশ্যে চলে আসে বিজেপি অভ্যন্তরীণ কলহ। সেই অন্তর্দ্বন্দ্ব তুঙ্গে উঠেছে মালদার হরিশ্চন্দ্রপুরে। সদ্য বিজেপিতে যোগ দিয়ে টিকিট পেয়েছেন মতিবুর রহমান, তার বিরুদ্ধেই বিক্ষোভ দেখান দলীয় কর্মী সমর্থকেরা। জেলা নেতৃত্বের নির্দেশে বিক্ষোভ কিছুদিনের জন্য থামলেও পুরোনো একটি খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তা পুনরায় চাগাড় দিয়ে উঠেছে। প্রার্থীকে মেনে নিতে না পেরে নির্দল প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিক্ষুব্ধ বিজেপি নেতা-কর্মীদের একাংশের।

পুরনো একটি খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ফের নতুন করে বিক্ষোভের সূত্রপাত বলে জানা গিয়েছে। ওই খুনের ঘটনায় বিজেপি প্রার্থী মতিবুর রহমানের এক দাদা জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ। বিষয়টি জানতে পেরেই বাড়ির সামনে থেকে মতিবুরের ছবি দেওয়া প্রচারের ফ্লেক্স খুলে রাস্তায় ফেলে দেন নিহতের ভাই সাওরমল আগরওয়াল। সাওরমল এলাকার সক্রিয় বিজেপি কর্মী। মতিবুর প্রার্থী হওয়ার পর বাড়িতে গিয়ে তাকে সংবর্ধনা দিয়েছিলেন সাওরমল। কিন্তু দাদার খুনের ঘটনায় অভিযুক্তের দাদা বিজেপি প্রার্থী, বিষয়টি জানার পর তাকে মানতে পারছেন না সাওরমল। ঘটনার কথা জানা জানি হতেই ফের ক্ষোভ ছড়ায়, “কানাইয়ালালের রক্ত, হবে নাকো ব্যর্থ”, শ্লোগান তুলে বাড়ির সামনে ঘটে বিক্ষোভের ঘটনাও। সেই বিক্ষোভে বিজেপি নেতা জিয়াউর রহমান, মনোরঞ্জন দাসরাও হাজির ছিলেন। যদিও বিষয়টি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন বিজেপি প্রার্থী। পাশাপাশি এসব তৃণমূলের চক্রান্ত বলেও বিজেপির তরফে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে এই ঘটনার জেরে বিক্ষুব্ধ বিজেপি নেতা-কর্মীরা জেলা বিজেপি কিষান মোর্চা প্রাক্তন সহ-সভাপতি তথা প্রাক্তন সৈনিক মনোরঞ্জন দাস কে নির্দল প্রার্থী হিসেবে হরিশ্চন্দ্রপুর বিধানসভায় দাঁড় করানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন। এবং এই ঘটনার জেরে মঙ্গলবার তারা চাঁচলে মনোনয়ন জমা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রিতিমত ডিজে, ব্যান্ড বাজিয়ে মিছিল বের করে মনোনয়ন পত্র জমা দিতে যান। ঘটনার পর তীব্র কটাক্ষ করেছে তৃণমূল, শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। যদিও বিজেপি বলেছে এই ঘটনার কোনো প্রভাব পড়বে না।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বিজেপির প্রার্থী ঘোষনার পরেই তুমুল বিক্ষোভ শুরু হয় হরিশ্চন্দ্রপুরে। পার্টি অফিসে ভাংচুর, টায়ার পুড়িয়ে বিজেপি নেতাদের একাংশের অবরোধ-বিক্ষোভে উত্তেজনা ছড়ায়। সাময়িকভাবে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও পুরনো ওই খুনের ঘটনার বিষয়টি সামনে আসতেই নতুন করে অসন্তোষ দানা বাঁধে। জানা গেছে, ২০১২ সালের ২ ডিসেম্বর খুন হয়েছিলেন হরিশ্চন্দ্রপুরের ব্যবসায়ী কানাইয়ালাল আগরওয়াল। ওই ঘটনায় পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করে ও তার জেলও হয়। ওই অভিযুক্ত বিজেপি প্রার্থীর দাদা বলে দাবি করেছেন নিহতের ভাই সাওরমল। ফলে বিজেপির একনিষ্ঠ কর্মী হলেও এমন একজনকে তিনি কিছুতেই প্রার্থী হিসেবে মানতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।

প্রথমে প্রার্থীকে ঘিরে দলের বিক্ষোভ। তারপর দুদিন আগে প্রচারে গিয়ে বধূকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠে প্রার্থীর বিরুদ্ধে। এবার পুরনো খুনের ঘটনায় একাংশের বিক্ষোভের বিষয়টি সামনে আসতেই বিব্রত বিজেপি নেতৃত্ব।

সাওরমল বলেন, আমি বিজেপিকে ভালোবাসি। কিন্তু আমার দাদাকে খুনে প্রার্থীর ভাই জড়িত ছিল জানার পর কিছুতেই তাকে সমর্থন করতে পারি না। আমরা নির্দল প্রার্থী দাঁড় করিয়ে বিজেপির কাছে ভোট চাইব।

জেলা সংখ্যালঘু মোর্চার প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল হক বলেন, আমরা মতিবুরকে মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু যখন জানতে পারি যে প্রার্থীর দাদা খুনে জড়িত ছিল তারপর আর তাকে সমর্থন করা যায় না। তাই আমরা অন্য সিদ্ধান্ত নিতে চলেছি। “আজ আমরা হরিশ্চন্দ্রপুর বিধানসভার ভূমিপুত্র মনোরঞ্জন দাসের সমর্থনে চাঁচল মহকুমায় মনোনয়ন পত্র জমা দিতে যাচ্ছি। আমরা চেয়েছিলাম হরিশ্চন্দ্রপুর থেকে কোনো শিক্ষিত মানুষ প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াক। কিন্তু যে নিজের নাম বলতে পারে না, ভারতের জাতীয় সঙ্গীত গাইতে জানে না তাকে কীভাবে হরিশ্চন্দ্রপুরের আদী বিজেপি মেনে নেবে?

বিজেপি নেতা তথা প্রাক্তন সৈনিক মনোরঞ্জনকুমার দাস বলেন, “আমি নির্দল প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াচ্ছি। আমি এতদিন বিজেপি করে এসেছি, জেলা থেকে মোর্চা ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলাম। কিন্তু এখানকার প্রার্থী ৪৬ নম্বর বিধানসভার জন্য ভালো নয়। তাই আমি নির্দল হিসেবে দাঁড়াচ্ছি। যদিও বিজেপি প্রার্থী মতিবুর রহমান বলেন, আমার কোনও দাদা নেই। তৃণমূল দালালি করে এসব করছে।

প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্ট অনিরুদ্ধ সাহা বলেন, যারা বিজেপির পতাকা খুলে ফেলে তাদের কীভাবে দলের কর্মী বলব। ওরা অন্য দলের হয়ে কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে।

এই প্রসঙ্গে হরিশ্চন্দ্রপুর-১ ব্লক তৃণমূল সভাপতি মানিক দাস বলেন, বিজেপি প্রার্থীকে নিয়ে দলের অন্দরেই ক্ষোভের জেরে ভাঙচুর, আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে। নিজেদের ত্রুটি আড়াল করতে তৃণমূলকে দালাল বলছে। আমাদের খেয়েদেয়ে কাজ নেই যে দালালি করতে যাবে?

সব মিলিয়ে প্রার্থী নিয়ে অসন্তোষে এখন জেরবার রাজ্য বিজেপি। ভোটের মরশুমে রীতিমত অস্বস্তিতে রয়েছে পদ্ম শিবির। বিজেপির বিরুদ্ধে এক তরফা ভাবে প্রার্থী ঘোষণার অভিযোগ এনেছে দলীয় কর্মীদের একাংশ।

ক্লিক করে পড়ুন ‘সাতসকাল’ ই-খবরের কাগজ

The post satsakal 12-05-2021 appeared first on satsakal.com.