শোভনকে দলে ফেরানোর রাস্তা প্রসস্ত করতেই কি সরানো হল রত্নাকে?

কোনও সাসপেন্স সিনেমার শেষ দৃশ্যে কী হয়, কী হয় করে যেমন দর্শকরা অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকে তেমনই পৌরভোটের আগে শোভন চট্টোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অবস্থানের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে রাজনৈতিক মহল। আসলে পৌর ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে ততই য্নে নিত্য-নতুন চমকের পর্দা উঠছে বঙ্গীয় রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে। বলা ভালো, কলকতা পৌরসভার প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে যেন দড়ি টানাটানির খেলায় মেতেছে শাসক-বিরোধী দুই শিবির।

কিন্তু যাকে নিয়ে জল্পনার এই দড়ি টানাটানি কী বলছেন সেই শোভন চট্টোপাধ্যায়! না, কিছুই বলছেন না তিনি। আর তাতেই চড় চড় করে বাড়ছে জল্পনার পারদ।

রাজনৈতিক সন্ন্যাস কাটিয়ে শোভনকে সক্রিয় করতে কার্যত আদা জল খেয়েই ময়দানে নেমে পড়েছে দু-পক্ষই। আর শোভনকে নিয়ে দড়ি টানাটানিতে কখনো পাল্লা ভারি হচ্ছে বিজেপির দিকে আবার কখনো তৃণমূলের দিকে। এ জন্যই হয়তো বলে, পলিটিক্স ইজ দ্য আর্ট অফ পসিবিলিটি।

রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, পৌর ভোটের আগে বিজেপিতে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারেন কলকাতা পৌরসভার প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়। আবার আর একাংশ মনে করছে পুরনো দলেই ফিরে যেতে পারেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্নেহের কানন। এই নিয়ে চাপানউতরও কম নেই। রাজনৈতিক মহলের অনেকেই মনে করছেন, তৃণমূলে ফেরা শোভনের পক্ষে আর সম্ভব নয়। তার অন্যতম কারণ তৃণমূলের অন্দরেই অনেকে চাইছেন না শোভন দলে ফিরুক। যদিও পৌরমন্ত্রী ফিরাদ হাকিম থেকে শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় একাধিকবার দলে ফেরা নিয়ে রুদ্ধ দ্বার বৈঠক করেছেন শোভনের সঙ্গে। মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং কথা বলেছেন তাঁর প্রিয় ভাইয়ের সঙ্গে, কিন্তু তাতেও বরফ গলেনি। উল্টে এক সময় তিনি ও বৈশাখি বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে বিজেপির প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে গেরুয়া শিবিরের পতাকা তুলে নেন। তখন কার্যত নিশ্চিত হয়ে যায় ভারতীয় জনতা পার্টির হয়ে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যাবে শোভন চট্টোপাধ্যায়কে। কিন্তু তার পরেই আসে নাটকীয় মোড়। বঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি দীলিপ ঘোষ সহ একাধিক নেতার বক্তব্যে মনখুন্ন হন শোভন। একসময় সদ্য যোগদান করা বিজেপি দল ছাড়ারও ইচ্ছা প্রকাশ করেন শোভন। এরপর ভাইফোঁটার দিন শোভন-বৈশাখিকে দেখা যায় কালীঘাটে মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতে। এরপর কলকাতা ফিল্ম ফেস্টেও। তখন রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করেছিল পাশা ওল্টাতে চলেছে। তৃণমূলে ফিরতে চলেছে শোভন।

আরও পড়ুন: শোভনের রাজনৈতিক সক্রিয়তা নিয়ে বিজেপির অন্দরেই কি রয়েছে বিতর্ক!

তারপর গঙ্গা-যমুনা দিয়ে বয়ে গেছে অনেকটা জল ‘তবু শোভন সক্রিয় হয় নাই’। তৃণমূলের কোনও কার্যকলাপে অংশ গ্রহন করেনি শোভন। উল্টোদিকে বিজেপিরও কোন কার্যকলাপে দেখা যায়নি তাঁকে। উল্টে বিজেপি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাইরে ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত আছেন বলে এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু দুটি ঘটনায় সম্প্রতি সরগরম হয়ে ওঠে রাজ্য-রাজনীতি। ঘটনা ১- বেহালা সহ কলকাতায় বিজেপির পোস্টারে শোভনের ছবি। ঘটনা ২- ধর্মতলার সভায় দাঁড়িয়ে অমিত শাহের ঘোষণা, তিনি কারো নাম না করেই বলেন, বিধানসভা নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রীর মুখ হিসেবে দেখা যাবে এরাজ্যের ভূমি পুত্রকেই। এখান থেকেই আবার জল্পনার পারদ চড়তে শুরু করে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের। যদিও এনিয়ে শোভন চট্টোপাধ্যায়ের কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

এরপর মাত্র এক সপ্তাহ আগেই রত্না চট্টোপাধ্যায়ের হাতে তাঁর স্বামী শোভন চট্টোপাধ্যায়ের বেহালা পূর্বের দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল তৃণমূল নেতৃত্ব। রত্নাকে পাশে বসিয়ে তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘বেহালা পূর্বের যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করতে প্রতিটি কাউন্সিলরের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করবেন রত্না।’ এরপরেই কার্যত শোভনের ঘর ওয়াপসির পথ বন্ধ হয়ে যায় বলে মনে করেন রাজনৈতিক মহল থেকে শোভন ঘনিষ্ঠরা। তারপরই শোনা যায়, শোভন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। সে কথা প্রায় স্পষ্টও করে দেন শোভনের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী বৈশাখি চট্টোপাধ্যায়।

তবে রাজ্য নেতৃত্বকে এড়িয়ে সরাসরি বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখেনি বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্ব। ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানতে পারা যায়, শোভনকে নিয়ে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের অন্দরেও ক্ষোভ রয়েছে। অনেক নেতা-নেত্রীই শোভনকে মেনে নিতে পারছে না। তবে রাজ্যের শাসক দলর বিরোধী মুখ হিসেবে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যে শোভনকে পছন্দ করছে একথা বলাই বাহুল্য।

এমত অবস্থায় শোভনকে তৃণমূলে ফেরাতে রত্না পূর্ব বেহালার দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখান থেকেই রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, তৃণমূলও হারতে চাইছে না তাদের পুরনো দিনের সহকর্মী তথা পোড় খাওয়া রাজনীতি বিদ শোভনকে।

আরও পড়ুন:  আতঙ্কের অন্য নাম, করোনা

রত্নার সরে যাওয়ার প্রসঙ্গে বৈশাখী কোনও মন্তব্য করতে না চাইলেও গত মঙ্গলবার শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। সূত্রের খবর, পার্থর বাড়িতে গিয়ে বৈশাখী জানিয়ে আসেন, শোভনের বিষয়ে তৃণমূল আগ্রহ না দেখালে, পুরভোটের আগে তিনি বিজেপি-তে সক্রিয় হলে আর কিছু করার থাকবে না। এই আবহে শোভনকে সক্রিয় করতে তত্‍পর হয় গেরুয়া শিবির। কলকাতার প্রাক্তন মেয়রের সঙ্গে যোগাযোগ করেন স্বয়ং বিজেপি সর্বভারতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডা। এরই পাশাপাশি তৃণমূল শিবিরেও তৎপরতা দেখা যায়। তবে শোভন ঘনিষ্ঠ নেতা সুশান্ত সবাইকে নিয়ে কাজ করার কথা বলেন। যদিও তৃণমূলে ফেরাটা শোভনের ব্যক্তিগত বিষয় এবং দলের সিদ্ধান্ত বলে জানান তিনি। তবে পার্থ-বৈশাখির বৈঠকের পর পূর্ব বেহালার দায়িত্ব থেকে রত্নার সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত শোভনকে দলে ফেরাতে তৃণমূলের মাস্টার স্ট্রোক হিসেবেই দেখছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।

এই পরিপ্রেক্ষিতে আবারও শোভনকে খোঁচা দিয়েছে বিজেপি রাজ্য নেতৃত্বের একাংশ। সব্যসাচী দত্ত বলেন, ‘উনি বৃহত্তর কাজে ব্যস্ত আছেন, তাই দলের কর্মসূচিতে আসেন না।’ তাহলে কি পুরভোটের আগে তৃণমূলেই সক্রিয় হবেন শোভন?’

এখন দেখার শেষ বলে ছক্কা হাঁকিয়ে তৃণমূল কি পারবে শোভনট্রফি জিততে নাকি দীলিপ ব্রিগেডের হাত ধরে গেরুয়া শিবিরে যাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক সময়ের প্রিয় কানন!

ক্লিক করে পড়ুন ‘সাতসকাল’ ই-খবরের কাগজ

The post satsakal 12-05-2021 appeared first on satsakal.com.