পরিযায়ী শ্রমিক খুনের ঘটনায় নতুন মোড়, গণপ্রহারের ভাইরাল ভিডিও প্রকাশ্যে

তনুজ জৈন (মালদা): গত সপ্তাহের শেষ অর্ধে মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুরে এক বর্বরোচিত ঘটনার সাক্ষী ছিল এলাকাবাসী। আবার ওই ঘটনারই গণপ্রহারে ভিডিও সামনে আসতেই নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়ালো হরিশ্চন্দ্রপুর এলাকায়। ভিডিওতে  দেখা গেল প্রতাপ কে মেরে নগ্ন করে সুইয়ে দেওয়া হয়েছে মেঝেতে। হাত-পা দড়ি এবং শেকল দিয়ে তালা চাবি বন্দি। কাতর কণ্ঠে বাঁচার জন্য আর্জি করছে প্রতাপ। চাইছে জল। জলতো মেলেনি উল্টে শুনতে হয়েছে হাত পা কেটে নেওয়ার হুমকি, চোখ খুবলে দেওয়ার হুমকি। আর এই ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই হরিশ্চন্দ্রপুর এলাকা জুড়ে চাঞ্চল্য শুরু হয়েছে। ঘটনায় নতুন মোড়। অনেকেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন গণপ্রহারের ঘটনা প্রতাপ কে দোষী সাব্যস্ত করতেই তার অন্তর্বাস থেকে ক্যামেরার সামনে মোবাইল টেনে বের করা হচ্ছে। যেখানে এলাকাবাসীর দাবি এত মারধর ও শেকল দিয়ে হাত-পা বন্দী করার পরেও কেমন করে চুরি যাওয়া মোবাইল অন্তর্বাসের মধ্যে আটকে থাকে। এ যেন তালিবানি শাসনের চিত্র ধরা পরল মালদা জেলা হরিশ্চন্দ্রপুরের মালীওর গ্রামে। মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুরে গণপিটুনিতে নিহত প্রতাপের এমনই একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। নিহতের পরিবারের দাবি, প্রহারকারীরা তখনও জানতেন না যে প্রতাপ মরে যাবেন। ফলে তাকে মোবাইল ফোন চোর প্রমাণ করতে পরিকল্পনা করেই এমনটা করা হয়েছিল। পরিবারের দাবি যে অমূলক নয় তা পুলিশ সূত্রেও জানা গিয়েছে। ঘটনার পরেই পুলিশ এক মহিলাকে গ্রেফতার করে হেফাজতে নিয়েছে। প্রতাপ চুরি করতে ঢুকেছিল, সে চুরি করার আগেই ধরে ফেলা হয় বলে জেরায় পুলিশের কাছে মহিলা দাবি করেছেন। ফলে চোর সন্দেহে নয়, প্রতাপ খুনে অন্য কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন পুলিশকর্তাদের একাংশ। তবে কি সেই কারণ তা এখনও স্পষ্ট নয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

গত শুক্রবার পিপুলতলা এলাকায় গণপিটুনির শিকার হন প্রতাপ। পরদিন হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। প্রতাপ জানালার কাচ ভেঙে ঘরে ঢুকে মোবাইল চুরির চেষ্টা করেন বলে গুজব রটে যায়। পরিবার অবশ্য প্রথম থেকে সেই দাবি মানতে চায়নি। তারা ১৯ জনের বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ করেন। তাকে ফোনে ডেকে নিয়ে গিয়ে খুন করা হয়েছে বলে দাবি তাদের। যে বাড়িতে চুরির চেষ্টার অভিযোগে প্রথম মারধর শুরু হয় সেই পরিবারের এক মহিলাকে গ্রেফতার করে হেফাজতে নেয় পুলিশ। জেরায় মহিলার দাবি, চুরির আগেই প্রতাপকে ধরে ফেলা হয়। কিন্তু এদিন সকাল থেকেই হাত-পা বাঁধা অচেতন অবস্থায় প্রতাপের অন্তর্বাস থেকে মোবাইল বের করার ভিডিওটি ভাইরাল হতে শুরু করে। তখনও তারা জানতেন না যে প্রতাপ মরে যাবেন। ফলে তার নামে চোরের অপবাদ দিতেই এমনটা করা হয়েছিল বলে সন্দেহ করছেন পরিবারের লোকজন। পাশাপাশি প্রতাপের নামে পুরনো অপরাধের কোনও রেকর্ড যে নেই তা পুলিশ সূত্রেই জানা গিয়েছে। কিন্তু কেন প্রতাপকে খুন করা হল সেই প্রশ্নটাই এখনও বাসিন্দাদের পাশাপাশি পরিবারের মনেও ঘুরপাক খাচ্ছে। এছাড়া চুরি করলেও আইন হাতে নিয়ে কাউকে এমন নৃশংসভাবে খুন করা হবে কেন সেই প্রশ্নও উঠেছে। এদিকে প্রতাপের বাড়িতে বিধায়ক তজমুল হোসেন ছাড়া এখনও কেউ যাননি। ঘটনার পরদিনই প্রতাপের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন বিধায়ক। তিনি পরিবারটির পাশে থাকার আশ্বাসও দেন।

পরিবারের দাবি কয়েকদিন আগেই প্রতাপ নতুন মোবাইল কিনে ছিল তার ছবিও প্রকাশ্যে এসেছে, এত মারধর করে শিকল পরিয়ে বেঁধে হাত-পা বেঁধে রাখার পরেও তার অন্তর্বাস থেকে মোবাইল বেরিয়ে পরলো না এটাও একটি সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এলাকাবাসীর কাছে। উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতেই এই মোবাইল ভিডিও গণপ্রহারে অভিযুক্তরা সাজিয়ে ভাইরাল করেছে এতে এক প্রকার নিশ্চিত এলাকার বাসিন্দারা। কিন্তু এই ভিডিও ভাইরাল করতে গিয়ে নিজেরাই যে নিজেদের ফাঁদে পা দিয়েছে তা বুঝতে পারেননি তারা।

ছেলেকে হারিয়ে এখনও চোখের জল থামেনি প্রতাপের মা সন্জু মণ্ডলের। এদিন তিনি বলেন, আমি প্রথমদিন থেকেই বলে আসছি, আমার ছেলে চোর ছিল না। ওকে ডেকে নিয়ে গিয়ে খুন করা হয়েছে। পুলিশই খুঁজে বের করুক কেন আমার ছেলেকে এভাবে খুন হতে হল।

এদিকে বাকি অভিযুক্তদের খুঁজে জোরদার তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ প্রশাসন। নিস্তব্ধ হয়েছে প্রতাপের পাড়া। তবে এলাকায় এখনও পর্যন্ত বিধায়ক ছাড়া বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম, কোন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি কে দেখা যায়নি। এতেও ক্ষুব্ধ এলাকার বাসিন্দারা। শুধুমাত্র ভোট চাইতে বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম কে দেখা যায়। মানুষের বিপদে দেখা যায় না বলে এলাকার বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করলেন।

হরিশ্চন্দ্রপুরের আইসি সঞ্জয়কুমার দাস বলেন, প্রতাপের বিরুদ্ধে চুরির অপবাদ কতটা সত্যি তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি খুনের পিছনে সবরকম সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।